কাব্যের উপেক্ষিতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধ সাজেশন ২০২২ | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর ২০২২ | ফার্স্ট সেমিস্টার কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধ



কাব্যের উপেক্ষিতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তরসহ | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

১। রবীন্দ্রনাথ কোন্ কোন্ নারী চরিত্রগুলিকে কব্যে উপেক্ষিতা বলেছেন ? 

উ: রবীন্দ্রনাথ ঊর্মিলা, অনসূয়া, প্রিয়ংবদা এবং পত্রলেখাকে কাব্যে উপেক্ষিতা বলেছেন।

২। 'কাদম্বরী' আখ্যায়িকার নায়ক নায়িকা কে?

উঃ কাদম্বরীর নায়ক চন্দ্রাপীড় এবং নায়িকা কাদম্বরী।

৩। কে পত্রলেখাকে কার মাধ্যমে চন্দ্রাপীড়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন?

উ: রাজমাতা বিলাসবতী কঞ্ঝকীর মাধ্যমে পত্রলেখাকে চন্দ্রাপীড়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। 

৪। পত্রলেখার পরিচয় দাও ?

উঃ পত্রলেখা পরাজিত রাজা কুলুতেশ্বরের কন্যা। সে ছিল রাজবন্দিনী। অনতিযৌবনা এই নারীকে রাজমাতা বিলাসবর্তী যুবরাজ চন্দ্রাপীড়ের 'তাম্বুলকরষ্কবাহিনী' করে পাঠিয়েছিলেন।

৫। সমগ্র রামায়ণ মহাকাব্যে ঊর্মিলাকে কয়বার দেখানো হয়েছে এবং কাথায় দেখানো হয়েছে?

উঃ সমগ্র রামায়ণ মহাকাব্যে উর্মিলাকে একবার মাত্র দেখানো হয়েছে, তাও বধূবেশে বিদেহনগরীর রাজসভায়।

৬। প্রিয়ংবদা-অনসূয়া কার লেখা কোন নাটকের চরিত্র ?

উ: মহাকবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' নাটকের দুটি নারী চরিত্র। এরা আশ্রমপালিতা শকুন্তলার দুই সহচরী।

৭। মাণ্ডবী কে?

উ: জনক রাজ কন্যা; ভরতের পত্নী।

৮। 'কাব্য হীরার টুকরার মতো কঠিন'–কে কোথায় একথা বলেছেন?

উ: রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যে উপেক্ষিতা প্রবন্ধে একথা বলেছেন।

৯। 'অতএব এই নামটির জন্য বাল্মীকির নিকট কৃতজ্ঞ আছি'—বাল্মীকি কে? কোন নামের কথা বলা হয়েছে?

উ: বাল্মীকি ছিলেন রামায়ণের রচয়িতা এখানে ঊর্মিলার কথা বলা হয়েছে।

১০। কাব্যের উপেক্ষিতা করে লেখা হয় ?

উঃ ১৩০৭ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে।

১১। কাব্যের উপেক্ষিতা কাকে কাকে উৎসর্গ করে লেখা?

উ: বাল্মীকি, কালিদাস ও বাণভট্টকে।

১২। চন্দ্রাজীর কে ?

উঃ বাণভট্টের কাদম্বরী কথার নায়ক।

১৩। মহাশ্বেতা কে ?

উ: কাদম্বরীর সখী মহাশ্বেতা। 

১৫। 'তুমি প্রত্যুষের তারার মতো' কার সম্বন্ধে বলা হয়েছে? 

উ: কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধে লক্ষ্মণ পত্নী ঊর্মিলার সম্বন্ধে প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উক্তি করেছেন।

১৬। 'নামকে যারা নামমাত্র মনে করেন আমি তাহাদের দলে নই'—ব্যাখ্যা করো। 

উঃ রামায়ণের সর্বজন উপেক্ষিতা ঊর্মিলার নামের মাধুর্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এই মন্তব্য করেছেন। তার মতে গোলাপ প্রকৃতির দান তাই এর মাধুর্য সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ কিন্তু মানুষের মাধুর্য এমন সর্বাংশে সুগোচর নয় তার মধ্যে অনেকগুলি সূক্ষ্ম সুকুমার সমাবেসে অনির্বচনীয়তার উদ্রেক করে। শুধু ইন্দ্রিয় নিয়ে নয় তাকে কল্পনা দিয়ে সৃষ্টি করতে হয়। নামকরণ সেই সৃষ্টি কাব্যে সাহায্য করে।

১৭। ঊর্মিলাকে রামায়ণে ও ভবভূতি কাব্যে কীরূপে কোথায় দেখা যায়? 

উঃ রামায়ণে—বন্ধুবেশে বিদেহ নগরীর বিবাহসভায়। ভবভূতি কাব্যে-লক্ষ্মণ যখন ঊর্মিলার ছবি দেখছিলেন তখনই একবার ঊর্মিলাকে দেখা যায়। কাব্য হীরার টুকরার মতো কঠিন—কোথা হতে নেওয়া প্রসঙ্গা উল্লেখ করো। কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধ হতে নেওয়া। শকুন্তলার জীবনে তার সঙ্গীদ্বয় অনুসুয়া ও প্রিয়ংবদার গুরুত্ব বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ একথা বলেছেন। তাই তার চরম দুঃখের দিনে তাদের অনুপস্থিতী কাব্য বিচারে ন্যায় সংগত হলেও শকুন্তলার পথে তা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা। 

১৮। 'সেদিনকার সেই বিশ্বব্যাপী বিলাপের মধ্যে—সেদিনকার বলতে কোনদিনকার কথা বলা হয়েছে? 

উঃ যেদিন রামচন্দ্র সীতাদেবী ও লক্ষ্মণ অযোধ্যা ছেড়ে বনবাসে চলে যান সেইদিনের কথা এখানে বলা হয়েছে।

১৯। সীতা অশ্রু জলে ঊর্মিলা একেবারে মুছিয়া গেল—ব্যাখ্যা করো।

উঃ রামায়ণ রাম-সীতার দুঃখ ভারাতুর জীবন কাহিনি। লক্ষ্মণ সবসময় রামচন্দ্রের পাশে থেকে সর্বজনবিদিত হয়েছে। কিন্তু যে উর্মিলা তার স্বামী লক্ষ্মণকে রাম-সীতার জন্য উৎসর্গ করছে তার কথা রামায়ণে নেই। সে সীতার মহিমার আড়ালে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন সীতার অশ্রুজলে ঊর্মিলা একেবারে মুছিয়া যান।

২০। 'তাই কি কবি সীতার ঋণ মন্দির হইতে এই শোকাজুল মহা দুঃখিনীও একেবারে বাহির করিয়া দিয়াছেন'—ব্যাখ্যা করো।

 উঃ রবীন্দ্রনাথের মতে ঊর্মিলার দুঃখ সীতাদেবীর থেকে বেশি হৃদয়লাম। তাই বোধহয় কবি বাল্মীকি রামায়ণ সীতার সঙ্গে ঊর্মিলার প্রসঙ্গ আনেননি।

২১। রবীন্দ্রনাথের কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধে ঋষি শিষ্যদ্বয়, গৌতমী ও সখী দুজনের নাম লেখো। 

উঃ ঋষি শিষাদয়—শারাব ও শাবা, গৌতমী— ঋষি কমের ভগিনী এবং সখী দুজন হলেন প্রিয়ংবদা ও অনুসূয়া।

২২। শকুগুলাকে রাজা দুষ্মন্ত চিনতে পারেনি কেন?

উঃ রবীন্দ্রনাথের মতে হয়তো এর দুটি কারণ। প্রথমত রাজসভায় শকুন্তলা একা গিয়েছিল কিন্তু তার সখীছয় ছাড়া সে সম্পন্ন নয় সে খণ্ডিত এবং দ্বিতীয়ত শকুন্তলা অরণ্য প্রকৃতির মধ্যেই অনন্য। কিন্তু রাজসভা ছিল তপোবনের বাহিরে। তাই রাজা দুষ্মও রাজসভার মধ্যে বেমানান এবং খণ্ডিতা শকুন্তলাকে চিনতে পারেননি। 

২৩। 'গোলাপকে যে নাম দেওয়া যাক তাহার মাধুর্যের তারতম্য হয় না'- কার উক্তি কোথা থেকে নেওয়া।

উঃ শেকস্পীয়র তার বিখ্যাত নাটক রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে এই উক্তি করেছেন।

২৪। বিশ্রান্ত শব্দের অর্থ কী?

উ: গোপনীয়।

২৫। 'তাহারা তো ছায়া নহে–কারা ছায়া নয় এবং কেন ?

উঃ শকুন্তলার দুই সখী প্রিয়ংবদা ও অনুসূয়ার কথা বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মতে শকুন্তলার সঙ্গে তারা অন্তর্হিত হয়নি। তারা জীবন্ত এবং কাব্যের বাহিরের জগতে অনভিনীত নাটকের নেপথ্যে তার বেড়ে উঠেছে। তাই তারা ছায়া নয়।

২৬। ‘সংস্কৃত সাহিত্যে আর এক অনাদৃতা আছে—কার কথা বলা হয়েছে?

উঃ এখানে বাণভট্টের 'কাদম্বরী কথা'র পত্রলেখার কথা বলা হয়েছে।

২৭। পত্রলেখা কে? সে কোন কাব্যের নায়িকা ?

উঃ পত্রলেখা পরাজিত লুকুরেশ্বরের মেয়ে এবং বাণভট্টের কাদম্বরী'র উপেক্ষিতা নায়িকা। 

২৮। পত্রলেখা কার কাছে বড়ো হয়েছে?

উঃ রাজমাতা মহাদেবী বিলাসবতীর কাছে পত্রলেখা মেয়ের মতো বড়ো হয়েছে।

২৮। চন্দ্রাপীড় ও পত্রলেখার সখীত্বকে রবীন্দ্রনাথ কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন? 

উঃ দুই সমুদ্রের মধ্যে একটি বালুতটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাদের সঙ্গীত্বকে তুলনা করেছেন। 

৩০। কাদম্বরী আখ্যায়িকার যুবরাজ, কণুকী ও রাজমাতার নাম লেখো।

উঃ যুবরাজ–চন্দ্রাপীড়, কণ্ডুকী –কৈলাস, রাজমাতা (যুবরাজের মাতা)—মহাদেবী বিলাসবর্তী। 

৩১। চন্দ্রাপীড়ের পুরুষ সখার নাম কী?

উ: বৈশম্পায়ন। 

৩২। ‘সেবার সসমূপজাতানন্দা' ও 'উপদীয়মানা' শব্দ দুটির অর্থ কী? 

উত্তর : সেবারসসমুপজাতোনন্দা – যে নারী অপরকে সেবা করে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ রস উপলব্ধি করেন উপদীয়মানা—ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে এমন।

৩৪। ইহাকে সামান্য পরিজনের মতো দেখিয়ো না'—কার কথা বলা হয়েছে প্রসঙ্গ উল্লেখ করো। 

উঃ পত্রলেখার সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধে একথা বলা হয়েছে। বিসালাক্ষ্মী তার পুত্র চন্দ্রাপীড়ের কাছে পত্রলেখাকে প্রেরণ করেন এবং সেই সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে সতর্ক করে তাকে নির্দেশ দেন সে যেন পত্রলেখাকে চাপলা থেকে আচরণ করতে শিষ্যার মতো সুহৃদের মতো সমস্ত বিশ্রদ্ধ ব্যাপারে অভ্যন্তরে নিতে অতি চির পরিচারিকা হতে পারে এমন কাজে নিযুক্ত করেন।

৩৫। কবি সেই অনাথা রাজকন্যাকে চিরদিনই এই অপ্রশস্ত আশ্রয়ের মধ্যে বসাইয়া রাখিয়াছেন'—অনাথা রাজকন্যা কে?

উঃ অনাথা রাজকন্যা হলেন পরাজিত সুকতেশ্বরের দুহিতা বন্দিনী পত্রলেখা। 

৩৬। কাব্যের মধ্যে সে এত উপেক্ষিতা'—কে কোন কাব্যে উপেক্ষিতা?

উ: পত্রলেখা বাণভটে কাদম্বরীকথা কাব্যে উপেক্ষিতা।

৩৭। কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধে কেন কোন গ্রন্থের নাম আছে?

উঃ ‘রামায়ণ', 'শকুন্তলা', 'কাদম্বরী কথা' নাম উল্লেখ আছে। 

আরোও পড়ুন _' সাহিত্যের উদ্দেশ্য (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধের সাজেশন ২০২২ | 1st semester Bangla sahitter uddesso suggestion 2022

কাব্যের উপেক্ষিতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধের রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তরসহ | কাব্যের উপেক্ষিতা প্রবন্ধের বড় প্রশ্নোত্তর | মধ্যম মানের প্রশ্ন ও উত্তর


১। “পক্ষপাতকৃপণ কাব্য তাহাদের জন্য স্থান সংকোচ করিয়াছে বলিয়াই পাঠকের হৃদয় অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে আসন দান করে।” – (ক) লেখক কেন পক্ষপাতকৃপণ বলেছেন? (খ) এখানে কোন কোন সংস্কৃত কাব্যগুলির চরিত্র সৃষ্টিতে পূর্ণতা লাভ করে নি? (গ) পাঠক হৃদয়ে তাদের স্থান লেখক কোথায় রেখেছেন?

উত্তর :  (ক) সংকলিত বাক্যটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “প্রাচীন সাহিত্য" গ্রন্থের অন্তর্গত "কাব্যের উপেক্ষিতা" প্রবন্ধ (অনু-২) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য-সমুদ্র মন্থন করে লেখক এমন কয়েকটি নারী চরিত্র এখানে উপস্থিত করেছেন যারা নানাবিধ রূপ-গুণের অধিকারিণী হওয়া সত্ত্বেও তাদের সৃষ্টিকর্তা কবিদের দ্বারা কাব্যের মধ্যে উপেক্ষিতা রমণীতে পরিণত হয়েছে। হৃদয়বাদী কবি রবীন্দ্রনাথ তাদের অন্তরের অকথিত বাণীগুলি যে সংস্কৃত কাব্যে স্থান পায়নি, সেই কাব্যগুলিকেই পক্ষপাত কৃপণ কাব্য বলেছেন। (খ) রামায়ণের ঊর্মিলা, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ নাটকের অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা এবং কাদম্বরী কাব্যের পত্রলেখা তাদের সৃষ্টিকর্তা কবিদের দ্বারা উপেক্ষিতা হয়েছেন অভিযোগ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। রামায়ণে ঊর্মিলার স্বার্থ-ভ্যাগ ও দুঃখ স্বীকার যথেষ্ট মহত্ত্বমণ্ডিত অনুভবের সঙ্গে চিত্রিত হতে পারত। শকুন্তলা নাটকেও অনসূয়া-প্রিয়ংবদার সরিতা যথেষ্ট অভিনন্দনের যোগ্য। আর কাদম্বরী কাব্যের পত্রলেখার তৃষিত হৃদয়ের কোনো সংবাদই কবি নাটকে স্থান দেননি। একথা যে কোনো সাহিত্য সমালোচকই স্বীকার করবেন যে, কাধ্যের মধ্যে সকলের সমান অধিকার থাকতে পারে না। প্রধান চরিত্র বা নায়ক নায়িকার চরিত্রের বিকাশ ও পরিণতির জন্য অনেক পার্শ্বচরিত্র সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো তাদের লাবণ্য, মহিমা, মাধুর্য, সক্রিয়তা কিংবা স্বার্থ ত্যাগ প্রধান লক্ষ্য মূল চরিত্রের উৎকর্ষ ও বিবর্তন প্রদর্শন; সেইহেতু কাব্যের আনুষঙ্গিক চরিত্রগুলিকে কেবলমাত্র তাদের ভূমিকাটুকু পালন করেই কাব্যক্ষেত্রে হতে বিদায় নিতে হয়।

(গ) ঐ সকল চরিত্রগুলি কাব্যক্ষেত্র বা রামণ থেকে বিদায় নিলেও অনুভূতিশীল পাঠকের হৃদয়ে তাদের জন্য একটি স্থায়ী আসন সংরক্ষিত হয়ে যায়। কাব্যে তারা উপেক্ষিতা হলেও জীবনে তাদের আসন অমলিন। এমনি করেই ঊর্মিলা, অনসূয়া, প্রিয়ংবদা, পত্রলেখা রবীন্দ্রনাথের মারফৎ আমাদের চেতনায় স্থায়ী আসন লাভ করেছে। কাব্যে উপেক্ষিতা হলেও বাস্তব জীবনক্ষেত্রে তার উপেক্ষিতা নয় এটাই লেখকের ধারণা।


২। নামকে যাঁহারা নামমাত্র মনে করেন, আমি তাহাদের দলে নই। – (ক) উপেক্ষিতা চরিত্রগুলির মধ্যে কোন চরিত্রটির প্রসঙ্গে লেখক এ মন্তব্য করেছেন? (খ) কেন লেখক 'তাঁহাদের দলে নেই ব্যাখ্যা করো। (গ) নাম যে নাম মাত্র নয়—এ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মতামত কি?

উত্তর : (ক) সংকলিত বাক্যটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'প্রাচীন সাহিত্য' এর অন্তর্ভুক্ত 'কাব্যের উপেক্ষিতা' প্রবন্ধ (অনু-৪) থেকে গৃহীত হয়েছে। সংস্কৃত কাব্যের উপেক্ষিতা চরিত্রগুলির নামকরণ নিয়ে তার বিশেষ মত প্রকাশ পেয়েছে এই উক্তির মধ্য দিয়ে। রামায়ণের একটি উপেক্ষিত নারী চরিত্র লক্ষ্মণের স্ত্রী ঊর্মিলার নামটির প্রসঙ্গে কবি এই মন্তব্য করেছেন। (খ) ইংরাজী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক কবি ও নাট্যকার শেকসপীয়রের Romeo and Juliet নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে জুলিয়েটের একটি উক্তি হল What's in a mame? That What which we call a rose By any other name would mell as sweet." অর্থাৎ নামে কি আসে যায়। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হক না কেন সে একই সুগন্ধ বিতরণ করবে। গোলাপ সম্বন্ধে একথা রবীন্দ্রনাথ মেনে নিলেও মানুষের নাম সম্পর্কে তাঁর ভিন্নতার মত আছে। তাঁর চেতনায় নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা নামের মধ্য দিয়ে এক একটি চরিত্র আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সীমা অতিক্রম করে কল্পনার রাজ্যে পৌঁছে যায়। নামকরণ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ সাধারণতঃ ব্যঞ্জনাধর্মী তার অসংখ্য কবিতা গল্প-উপন্যাস- প্রবন্ধই তাঁর প্রমাণ। গোলাপের সৌন্দর্য আংশিক দর্শনেন্দ্রিয় এবং আংশিক প্রাণেন্দ্রিয়ের দ্বারা আমাদের কাছে অনুভূত হয়। কিন্তু মানুষের গুণাগুণ সর্বাংশে প্রত্যক্ষ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। আপাতঃ দৃশ্যমান অংশটুকুর অন্তরালে মানুষের মাধুর্য অনেকটাই আত্মগোপন করে থাকে যাকে কল্পনার দ্বারা ধরতে হয়। প্রতিটি মনুষ্য চরিত্রের মধ্যেই কিছু স্বকায় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একটি গোলাপের সঙ্গে আর একটি গোলাপের পার্থক্য তার বর্ণ, আয়তন বা সুগন্ধের তারতম্যের উপর নির্ভরশীল কিন্তু মানুষে মানুষে পার্থক্য অনেক বেশী গভীর—যা কেবল ইন্দ্রিয়গম্য নয়। নাম এক একটি মানুষের প্রাথমিক পরিচয় বহন করে। চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, মাধুর্য বা কঠিনতা ইত্যাদি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা নামের মধ্য দিয়েই আমাদের কল্পনার লোকে নতুন আলোক এনে দেয়। ভীম, রাবণ, কিম্বা দ্রৌপদীর মতো পৌরাণিক নামগুলি আমাদের কল্পনায় এমন এক অনুভব সৃষ্টি করে যার দ্বারা তাদের চরিত্র সম্পর্কে প্রথম পাঠেই একটা ধারণা নামের মাধ্যমে আমাদের কাছে গৃহীত হয়।

(গ) ঊর্মিলা নামটির মধ্যে এমন এক মাধুর্যমণ্ডিত কোমলতা আছে যার দ্বারা সে সহজেই অনুভূতিশীল পাঠকের হৃদয়ের মধ্যে এক স্নেহ-ভালোবাসার আশ্রয় পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে সমান সংস্কৃত কাব্যসমুদ্রের মধ্যে উর্মিলাকেই উপেক্ষিতাদের মধ্যে সর্ব প্রথম স্থান দিয়েছেন—আমাদের মনে হয়, তার পেছনেও এই মধুর কোমল নামটির প্রস্তাব। বৈষ্ণব কবিদের হাতেও শ্রীমতী রাধার কণ্ঠে নামের মহিমার কথা শোনা যায়— নাম পরতাপে যদি গ্রহণ করলো গো।" অতএব নাম যে নাম মাত্র নয় একথা নিঃসন্দেহে স্বীকার করে নিতে হবে।

৩। তরুণশুভ্র ভালে যেদিন প্রথম সুন্দরবিন্দুটি পরিয়াছিলেন, ঊর্মিলা চিরদিনই সেইদিনকার নববধু। -লেখক কোন্ চরিত্র প্রসঙ্গে এই মন্তব্যটি করেছেন এবং কেন? (খ) ঊর্মিলাকে একবারের পর দ্বিতীয়বার কি অবস্থায় দেখা গিয়েছিল? (গ) কে ঊর্মিলা চিরদিনই সেদিনকার নববধূ?

উত্তর। (ক) উদ্ধৃত বাক্যটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ গ্রন্থ 'প্রাচীন সাহিত্যের অন্তগত বিষয়ী প্রধান কাব্যের উপেক্ষিতা (অনু-৭) থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। রামায়ণ তথা সংস্কৃত কাব্য সংসারের সর্বাধিক উপেক্ষিতা নারী চরিত্র ঊর্মিলার প্রসঙ্গে লেখক এই উক্তিটি করেছেন। রামায়ণের ঊর্মিলার স্বার্থত্যাগ ও বেদনার ইতিহাস সম্বন্ধে যে ঊর্মিলাকে আমরা এ প্রবন্ধে পাই তা বাল্মীকির হাতে সৃষ্ট হলেও বিকশত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাতে।

শিল্প সাহিত্যে আখ্যান বা প্রধান চরিত্রের বিকাশের প্রয়োজনে লেখক অনেক সময়ই গৌণ বা পার্শ্ব চরিত্র সৃষ্টি করেন। অনেক সময় দেখা যায়, চারিত্রিক গুণাবলীর জোরে এই খণ্ডভাবে চিত্রিত অপ্রধান কোনো কোনো চরিত্র পাঠকের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে থাকে। পাঠক দাবী করতে থাকেন তার বিকাশ ও যুক্তিসঙ্গত পরিণতি রামায়ণের ঊর্মিলা এমনই একটি চরিত্র তাই রবীন্দ্রনাথ এই উক্তিটি করেছেন।

(খ) উর্মিলার চরিত্র-চিত্রণে এই অভাবটির প্রতি রবীন্দ্রনাথ দৃষ্টি দিয়েছেন এখানে। বিশাল রামায়ণ মহাকাব্যে ঊর্মিলা সশরীরে পাঠকের সামনে এসেছে মাত্র একবার বিদেহনগরীর বিবাহসভার বধূরূপে। রাম-সীতার বিবাহের পরেই লক্ষ্মণ ঊর্মিলার পরিণয় ঘটে। তার সেই তরুণী নববধূ রূপটিই পাঠকেরমনে স্থায়ী হয়ে থাকে যেহেতু তার পরবর্তীকালের আর কোনো ছবি আমাদের সামনে উপস্থিত নেই। ভবভূতির “উত্তর রামচরিত"-এর "চিত্রদর্শন” নামক তৃতীয় অঙ্কে লক্ষণ ও সীতা ঊর্মিলার যে ছবিটি দেখেছিলেন, সেটিও তার তরুণী বধূমূর্তি।

(গ) তারপর রামায়ণের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। রামের অভিষেক পূর্ণ হবার আগেই মৃত্যু হয়েছে। রামের পাদুকা মাথায় নিয়ে অযোধ্যার শাসক হয়েছেন কৈকেয়ীর পুত্র ভরত। তারপর রামের বনবাসে সীতা হরণ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, বনবাস সমাপ্তির পর রাম লক্ষণ ও সীতার প্রত্যাবর্তন, রাজ্যাভিষেক, সীতার অগ্নিপরীক্ষা ইত্যাদি নানা যৌবন বিকাশের বা পরিণতির কোনো সংবাদই পাঠকের কাছে নেই। তাই ঊর্মিলা চিরকালের জন্য নববধূ হয়েই পাঠকের হৃদয়ের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে রইলেন।


১। “কাব্যসংসারে এমন দুটি একটি রমণী আছে যাহারা কবিকর্তৃক সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াও অমরলোক হইতে স্লষ্ট হয় নাই।”—কাব্যের উপেক্ষিত প্রবন্ধ অনুসরণ করে তাদের পরিচয় দাও।

উত্তর : বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্টতা তাঁর অনুভূতি নির্ভর রচনাগুলির মধ্যে বর্তমান। সাহিত্য তাত্ত্বিকরা প্রবন্ধকে মোটামুটি দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেন—বিষয় প্রধান আর বিষয়ী প্রধান। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ রচনাই বিষয়ী প্রধান। লেখকের অনুভূতির আলোকে সেগুলি আলোকিত। তাঁর প্রবন্ধ যতটা বুদ্ধি গ্রাহ্য, তার থেকে হৃদয় গ্রাহ্য। এ সম্পর্কে ডক্টর সুকুমার সেন লিখেছেন 'রবীন্দ্রনাথের রচনার বিষয়ীভূত বাহ্যবস্তু সম্পূর্ণভাবে তাঁহার স্বকীয় অনুভূতি ও চেতনার সহিত ওতপ্রোত হইয়া যায়। তিনি যাহা বর্ণনা করেন তাহা যেন নিজেরই বৃহৎ চেতনা ও ব্যাপক অস্তিত্বের সীমাবস্থিত।

'প্রাচীন সাহিত্য' গ্রন্থের অন্তর্গত এই কাব্যের উপেক্ষিতা' প্রবন্ধটির ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে প্রযোজ্য। এ প্রবন্ধের কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যানের গুরুত্ব নেই। কিম্বা কোন সাহিত্য সমালোচনা বা সাহিত্যে মূল্যায়নও নয় এটি। একে বলা যেতে পারে প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য সাহিত্যকে নির্ভর করে লেখকের অনুভূতিজাত বিশেষ বক্তব্য। সাধারণভাবে এমন কথা প্রায়ই বলা হয় যে, রবীন্দ্রনাথের গদ্য প্রবন্ধও কবির কলমে লেখা। কথাটি দুদিক থেকে সত্য। প্রথমতঃ গদ্যের ভাষা আর কবিতার ভাষা এখানে প্রায়ই মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। দ্বিতীয়তঃ হৃদয় বৃত্তির উপর বেশি করে গুরুত্ব আরোপ করার জন্য বক্তব্য বিষয়গুলি প্রায়ই কবিতার কাছাকাছি এসেছে। কাব্যের উপেক্ষিতা' সম্পর্কেও এই কথাগুলি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এখানে সংস্কৃত কাব্য-সংসারে লেখককর্তৃক উপেক্ষিতা চারিটি নারী-চরিত্রের উল্লেখ আছে। এরা এদের সৃষ্টিকর্তাদের কাছে যথোচিত মনোযোগ পায়নি। এ যাবৎকালের পাঠকবর্গেরও সে সম্পর্কে কোনো চেতনা দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম বিশেষ মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গীজাত অনুভূতির আলোকে নতুন নতুন মাত্রা সংযোজন করলেন।

এই উপেক্ষিতা চরিত্রগুলি হল রামায়ণের ঊর্মিলা, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ নাটকের অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদা এবং কাদম্বরী কাব্যের পত্রলেখা। প্রথম গ্রন্থটি মহাকাব্য, দ্বিতীয়টি দৃশ্যকাব্য এবং তৃতীয়টি গদ্যকাব্য। উল্লিখিত চারটি চরিত্রের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন বাতাবরণের মধ্যে হলেও একটি বিষয়ে সকলের মধ্যে ঐক্য দেখা যায়। তা হ'ল এরা প্রত্যেকেই প্রেম বঞ্চিত বা প্রেম পিয়াসী। ঊর্মিলা বিবাহিতা হলেও নবলব্ধ অনুভূতিটিকে প্রথম অন্তরে গ্রহণ করেছে। আর পুরুষের সহচরী পত্রলেখার জন্য এখনও সংসারে কোনো স্থান নির্বাচিত হয়নি।

এই চরিত্রগুলির সঙ্গে লেখক রবীন্দ্রনাথ ও কবি রবীন্দ্রনাথ অনুভূতির যোগে একাত্ম হয়ে গেছেন। যেন মনে হয় ঊর্মিলা, অনুসূয়া, প্রিয়ংবদা ও পত্রলেখার মনের গহন গোপন প্রদেশে সন্ধানী আলো ফেলে তাঁদের মনোজগতের আনন্দ-বেদনাকে একেবারে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছেন। কার্যক্ষেত্রে এই চরিত্রগুলি উপেক্ষিতা বলে রবীন্দ্রনাথের মনোযোগ পেয়েছিল। তার পাশাপাশি এদের মনোযোগ আকর্ষণের আরেকটি বড় শক্তি হল এদের অপূর্ব নাম। চারটি নামই লালিত্য, মাধুর্যে, কোমলতায় এবং নবযৌবনের ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে নামকরণ বা নাম গ্রহণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিগट মতামত প্রকাশ করেছেন এবং মহাকবি শেক্সপীয়রের বক্তব্যকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে ব্যাখ্যা করেছেন।

এ প্রবন্ধের প্রথমেই উপেক্ষিতাদের অন্যতমা হিসাবে 'রামায়ণ' মহাকাব্যের চরিত্র লক্ষণের ঊর্মিলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাল্মীকির কারো ঊর্মিলাকে প্রথম দেখা গিয়েছে বিদেহনগরীর বিবাহ সভায়। আর ভবভূতির 'উত্তর-রামচরিত'- '-এ 'চিত্রদর্শন' অধ্যায়ে। উভয় কাব্যেই সৃষ্টকর্তা ক্ষণকালের জন্য তাদের কবিতায় উর্মিলাকে উপস্থিত করেছেন। তারপর মহাকাব্যের মহাকোলাহলে ঊর্মিলা হারিয়ে গিয়েছে। তাঁর মনোজগতের খবর নেয়নি কেউ, এটাই রবীন্দ্রনাথের অভিযোগ— তিনি লিখছেন ঊর্মিলা চিরবধূ—নির্বাক কুণ্ঠিতা, নিঃশব্দচারিণী। নীরবে সে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার জন্য আত্মত্যাগ করেছে। রবীন্দ্রনাথের অভিযোগ উর্মিলাকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়ে সীতাকে আলোকের রাজ্যে উপস্থিত করা হয়েছে।

নবযৌবনা তরুণী ঊর্মিলা রঘুকুলবন্ধু হয়েও যৌবনের শ্রেষ্ঠ বারোটি বৎসর এক অসাধারণ ত্যাগস্বীকারের মধ্যে অতিবাহিত করেছিলেন। রামায়ণের প্রধান প্রধান ঘটনাবলী—যেমন রামের অভিষেক, রাম-লক্ষ্মণ-সীতার বনবাস যাত্রা, প্রত্যাগমন ইত্যাদিতে ঊর্মিলার মনের উপর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তার কোনো খবর বাল্মীকি আমাদের দেননি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— 'লক্ষ্মণ' তাঁহার দেবতাযুগলের জন্য কেবল নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন; উর্মিলা নিজের চেয়ে অধিক নিজের স্বামীকে দান করিয়াছিলেন, সেকথা কাব্যে লেখা হইল না। সীতার অশ্রুজলে উর্মিলা একেবারে মুছিয়া গেল। ঊর্মিলা নারী এবং মানবী। তার হৃদয়ের সংবাদ রামায়ণের কোথাও পাওয়া যায় না। বনবাসকালে উর্মিলা সে শত্ৰুবেষ্টিত কৈকেয়ী মন্থরা শাসিত রঘুপুরীতে একা কিভাবে দীর্ঘ বারো বৎসর অতিবাহিত করেছিল—কবি তা আমাদের জানাননি। আবার যৌবনের শ্রেষ্ঠ বারো বছর স্বামী-সুখ থেকে বঞ্চিতা হ'য়ে হয়তো শেষ পর্যন্ত এই সূক্ষ্ম অনুভূতিটিই হারিয়ে গিয়েছিল তার জীবন থেকে। ঊর্মিলার দুঃখ এবং ত্যাগ স্বীকারের মধ্যে এমন এক মহত্ব আছে যা প্রায়ই সীতাকে অতিক্রম করে যায়। তবু কবির কাছে সে তার নিজস্ব প্রাপ্যে মনোযোগ পায়নি। সংস্কৃত সাহিত্যের আরও দুজন উপেক্ষিতার কথা রবীন্দ্রনাথ এ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। এরা হ'ল প্রিয়ংবদা আর অনুসূয়া। শকুন্তলা নাটকে শকুন্তলার এই দুই প্রিয় সখী নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিল শকুন্তলার সুখের জন্য। দুষ্মন্ত শকুন্তলার প্রেম-পর্বে এই দুই সঙ্গীর ভূমিকা এতই অধিক ছিল যে পরবর্তীকালে রাজা দুষ্মন্ত তাঁর রাজসভায় শকুন্তলাকে চিনতে পারেননি—রবীন্দ্রনাথের মতে শকুন্তলার পাশে অনুসূয়া এবং প্রিয়ংবদা না থাকাই তার কারণ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতে চেয়েছেন। যে, দুষ্মন্ত একা শকুন্তলাকে ভালোবাসেন নি; ভালোবেসেছিলেন সেই তপোধন সহ শকুন্তলার দুই সঙ্গীকেও। এজন্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন একা শকুন্তলা শকুন্তলার এক তৃতীয়াংশ। শকুন্তলার অধিকাংশ। অনুসূয়া এবং প্রিয়ম্বদা, শকুগুলাই সর্বাপেক্ষা অল্প। কিন্তু তারাও মানবী, তারাও যুবতী। কবি কালিদাস তাদের সেই স্বতন্ত্র মনের খবর কখনো পাঠককে দেয়নি। একথা নিশ্চিত প্রেম নামক জ্ঞান বৃক্ষের ফল শকুন্তলার পাশাপাশি তারাও খেয়েছিল। কিন্তু শকুন্তলার পতিগৃহে গমনের পর এই দুই সখীকে আর কাব্যক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাদের মনের খবর কবি আমাদের নিতে বিস্মৃত হয়েছেন। তাই তারা ও কবি কর্তৃক উপেক্ষিতা।

সংস্কৃত সাহিত্যের আর একটি উপেক্ষিতা নারী রবীন্দ্রনাথের মনোলোক অধিকার করে আছে। এখানে সে হল 'কাদম্বরী' কাব্যের পত্রলেখা। 'কাদম্বরী কাব্য' এর পত্রলেখা আমাদের কাছে অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত। তাই রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে এর কাহিনি অংশ বিবৃত করে পত্রলেখার নারীত্বের প্রতি যে অবমাননা করা হয়েছে তার হৃদয়তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন। কাদম্বরী কাবো পত্রলেখাকে নারী রূপে উপস্থিত করা হয়েছে কিন্তু তার জন্যে কোনো স্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি। 'পরলেখা পত্নী নহে, প্রণয়িনীও নহে, কিংকরীও নহে পুরুষের সহচরী'। যৌবনের প্রারম্ভেই সে পিতৃমাতৃহীন হবে। বিজয়ী রাজপুর চন্দ্রাপীড়ের আশ্রিতা হয়েছিল। কিন্তু যুবক চন্দ্রাপীড়ের প্রতি আদেশ ছিল ইহাকে সামান্য পরিজনের মত দেখিয়ো না, বালিকার মতন লালনপালন করিয়া নিজের চিরবৃত্তির মতো চাপল্য, হইতে নিবারণ করিয়ো: শিষ্যার ন্যায় দেখিয়ো, সুহাদের ন্যায় সমস্ত বিভ্রান্ত ব্যাপারে ইহাকে অভ্যন্তরে লইয়ো যাহাতে এ তোমার প্রতি অতি চিত্রপরিচারিকা হইতে পারে। নারী-পুরুষের এমন সম্পর্ক একান্তই অভিনব। পত্রলেখা পুরুষের নয় কিন্তু একজন সুন্দরী যুবতীর প্রতি যুবকের যে দূরত্বের ব্যবধান থাকা উচিত, পত্রলেখার চতুর্দিক থেকে সেই আবরণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে চন্দ্রাপীত তাকে অনায়াসে আলিশান বন্ধ করে। কাদম্বরীর সঙ্গে চন্দ্রাপীড়ের প্রেম পর্ব তার সামনেই চলে অথচ এই নবযৌবনা সুন্দরী নারীটির হৃদয় যে প্রেম-বন্দ্বিতা রয়ে গেল, বাণভট্টের কল্পনায় তা একবারও কোনো আলোড়ন জাগালো না। সংসারে এবং কাব্যে পত্রলেখার কোনো নির্ধারিত স্থান ছিল, না। তাই তার প্রতি উপেক্ষা রবীন্দ্রনাথের হৃদয়বাদী কবিসত্ত্বাকে আলোড়িত করেছিল।

একথা ঠিক যে, কাব্যের মধ্যে সকলের সমান স্থান বা অধিকার থাকতে পারে না। সকলের পক্ষে কখনই প্রধান হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। নায়ক-নায়িকার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিতে গেলে পার্শ্বচরিত্ররা উপেক্ষিতা হয়। তবু কোনো চরিত্র—তার মাধুর্যে, ত্যাগে, তিতিক্ষায় কাব্যক্ষেত্রের সংকীর্ণ গন্ডী অতিক্রম করে পাঠকের হৃদয় স্থান লাভ করে। ঊর্মিলা, অনুসূয়া, প্রিয়ংবদা, পত্রলেখা এমনই কয়েকটি চরিত্র।


২। 'কাব্যের উপেক্ষিতা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ কোন কোন গ্রন্থের কোন কোন চরিত্রকে কাব্যের উপেক্ষিত বলেছেন। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন কাকে এবং কেন? 


উত্তর। 'প্রাচীন সাহিত্যের অন্তর্গত রবীন্দ্রনাথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধ 'কাব্যের উপেক্ষিতা'তে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য থেকে এমন কয়েকটি নারী চরিত্র চয়ন করা হয়েছে যারা ত্যাগে মাধুর্যে অনন্যা হয়েও কাব্যের মধ্যে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বর্ণিত হয়নি। তারা তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে আরো একটু গুরুত্বর দাবী করতেই পারে। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিবাদী দৃষ্টি এবং অনুভূতিশীল হৃদয় তাদের উপেক্ষায় অন্ধকার থেকে বর্তমান কালের পাঠকের চেতনার সামনে উপস্থিত করেছে। একথা ঠিক যে কাব্যের মধ্যে সবার সমান স্থান বা অধিকার থাকতে পারে না। তাই পক্ষপাতকৃপণ কাবা এক একটি চরিত্রের জন্য যতই স্থান সংকোচন করতে থাকে, পাঠকের হৃদয় ততই এগিয়ে এসে কাব্যের ভূমি থেকে তাদের হৃদয়ের ভূমিতে স্থান দিতে চায়।

রবীন্দ্রনাথের চোখে এমন কয়েকটি চরিত্র হল রামায়ণে লক্ষণের স্ত্রী ঊর্মিলা, অভিজ্ঞানম শকুন্তলমের সখী, অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদা এবং কাদম্বরীর পত্রলেখা। এদের মধ্যে অন্যতমা হল ঊর্মিলা। কারণ নামের মাধুর্যে চরিত্রের কোমলতায়, ত্যাগের মহিমায় উর্মিলা সমগ্র রামায়ণে একটি বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করলেও কাব্যসৃষ্টির কারণে কবি বাল্মীকি তাকে নিতান্ত সংকুচিত স্থানে আবদ্ধ রেখেছেন। কাব্যে নাটকে উপন্যাসে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। মূল ঘটনা ও প্রধান প্রধান চরিত্রের পরিপুষ্টির জন্য শিল্পীরা অনেক সময়ই নানা উপকাহিনি এবং গৌণ চরিত্রের অবতারণা করে থাকেন। এরা এদের নির্ধারিত ভূমিকাটুকু পালন করেই সৃষ্টিকর্তার অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে মা থেকে অন্তর্হিত হয়। এইসব গৌণ চরিত্রেরা অনেক সময় ক্ষণিকের আবির্ভাবেই পাঠকের মনে একটা স্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। সৃষ্টিকর্তা কবিদের কাছে এরা উপেক্ষিতা হলেও পাঠকের সহানুভূতির মধ্যে এরা স্থায়ী আসন লাভ করে।

ভারতের জাতীয় মহাকাব্য হল 'রামায়ণ'। এ কাব্যে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর রামচন্দ্ররূপে মানবলীলা, অযোধ্যার সিংহাসন নিয়ে রাজনৈতিক সংকট, রামের বনবাস, সীতা-হরণ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, সীতার অগ্নি-পরীক্ষা ও পাতাল প্রবেশ ইত্যাদি ঘটনাগুলিই ছিল প্রধান। এবং এগুলি বর্ণনার মধ্য দিয়ে স্বভাবতই বাল্মীকির দৃষ্টি অধিকাংশ সময় নিরুদ্ধ ছিল সীতার প্রতি। মনে হয় যেন কেবল সীতারই দুঃখভোগ এ চরিত্রের মহিমাকে উজ্জ্বলতর করার দিকেই দৃষ্টি রেখেছিলেন কবি। ফলে অন্য কোনো নারী চরিত্র— যারা সীতার পাশাপাশি ছিল প্রায় কেহ তেমন কোনো প্রাধান্য পায়নি। অথচ লক্ষ্মণের স্ত্রী ঊর্মিলা ত্যাগে, নারীত্বের মহিমায়, সৌন্দর্যে, মাধুর্যে কখনো কখনো সীতাকেও অতিক্রম করে গেলেও তাকে কবি তাঁর কাব্যের মধ্যে নিতান্ত গৌণ স্থান দিয়েছেন। ঊর্মিলার দুঃখভোগ এবং মানসিক যন্ত্রণা অনুধাবন করলে মনে হয় সীতার পাশে যে যথেষ্ট উজ্জ্বলতার সঙ্গে প্রতিবিম্বিত হবার মত চরিত্র। তবু বাল্মীকির 'রামায়ণ' ও ভবভূতির "উত্তররামচরিত' উভয় কাব্যেই দেখি ক্ষণিকের জন্য উর্মিলার উপস্থিতি। বাল্মীকির কাব্যে কেবল 'বিদেহনগরীর বিবাহসভায়' ঊর্মিলাকে একবার দেখা যায়। তারপর দীর্ঘ কাব্যের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের তৃষিত হৃদয় আর তাকে খুঁজে পায়নি। ভবভূতির উত্তররামচরিত'-এর “চিত্রদর্শণ' অধ্যায়েও একবার মাত্র ঊর্মিলার প্রসঙ্গের কথা উঠেছে। সীতা এবং লক্ষ্মণ তাঁদের পারিবারিক আলেখ্য দর্শণ করেছিলেন। একটি চিত্রের দিকে আঙ্গুলী নির্দেশ করে সকৌতুকে দেবর লক্ষ্মণের কাছে সীতা জানতে চেয়েছিলেন যে, সেটা কার ছবি। লক্ষ্মণ নিজের স্ত্রীর চিত্রটি লজ্জায় দ্রুত ঢেকে ফেলেছিলেন। এইভাবে সকলে মিলে ঊর্মিলাকে উপেক্ষার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের অভিযোগ হ'ল সমগ্র রামায়ণ কাব্যে ঊর্মিলাকে আরও বিস্তৃত করে উপস্থিত করবার যথেষ্ট অবকাশ ছিল। কিন্তু বাল্মীকি সীতার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে ঊর্মিলাকে উপেক্ষা করে গিয়েছেন। রাম-লক্ষ্মণ সীতার বনবাস যাত্রাকালে সমস্ত অযোধ্যাবাসীর বেদনার মধ্যে ঊর্মিলার বেদনার চিত্রও মহাকবি সহজেই অঙ্কন করতে পারতেন। পরে সুদীর্ঘ বারো বছর সেই শত্রুবেষ্টিত রঘুরাজপুরীতে বিরহিণী ঊর্মিলার দিনরাত্রি কীভাবে অতিবাহিত হয়েছিল — সমগ্র রামায়ণে তার কোনো খবর পাওয়া যায় না। আবার বনবাস সমাপ্ত হ'লে যেদিন রাম-লক্ষ্মণ-সীতা অযোধ্যায় ফিরে এলেন।

উর্মিলার সেদিনের আনন্দের ছবিও রামায়ণে আঁকা হয়নি। রামের অভিষেক অনুষ্ঠানে যারা মঙ্গাল শব্দ/ জানি করেছিল নিঃসন্দেহে সেই পুরীদের পুরোভাগে ছিলেন রাজবধূ উর্মিলা। কিন্তু সেখানেও তাকে আর দেখা গেল না। 'কাব্যের উপেক্ষিতা' প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে আমাদেরও এই ধারণা উপস্থিত হয়। পিতৃসত্য রক্ষার জন্য রামচন্দ্রের বনবাস যাত্রা নির্ধারিত ছিল। সীতাও স্বামীর অনুগমন করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ্মণের বনবাস যাবার না থাকলেও লক্ষ্মণ গিয়েছিলেন তাঁর উপাস্য দেবদেবী (রাম-সীতা) সেবা করতে। বারো বছর তিনি তাঁর সেই প্রিয় কাজে নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ বারোটি বছর স্বামীসঙ্গ থেকে বর্ণিতা অবস্থায় ঊর্মিলার কীভাবে কেটেছিল তা সহজেই অনুমেয়। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন তুলেছেন যে বিবাহের অব্যবহিত পরেই স্বামীর সঙ্গে ঊর্মিলার সযত্ন লালিত প্রত্যাশাটি নিশ্চয় বিনষ্ট করে দিয়েছিল। বারো বছর পর 'নববধূর সূচির প্রণয়লোক বঞ্ছিতা হৃদয়ে আর কি সেই নবীনতা ছিল।' একই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির রাধার কন্ঠ অকূল তপন তাপে যদি জারব কি করব বারিদ মেহে এ নব যৌবন বিরহে গোঙায়ব কি করব সোপিয়া-লেহে।। রাজর্ষি জনক সীতাকে সম্প্রদান করেছিলেন রামচন্দ্রের হাতে। প্রায় একই সময়ে লক্ষ্মণের সাথে ঊর্মিলার বিবাহ হয়। ভরত ও শত্রুঘ্ন বিবাহ করেছিলেন যথাক্রমে মান্ডবী ও শ্রুতকীর্তিকে। সমস্ত ক্ষেত্রেই কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন রাজা জনক। সীতা, ঊর্মিলা, মান্ডবী ও শ্রুতকীর্তি চারজনেই পরস্পরের ভগ্নী স্থানীয়া। চারজনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে উর্মিলার দুঃখই সর্বাধিক। ঊর্মিলার বনবাসে যেতে হয়নি কিন্তু প্রিয়জনবিহীন রাজপ্রসাদ তার কাছে স্বাপদসংকুল ভয়ঙ্কর ? থেকেও নির্মম হয়ে উঠেছিল। বাল্মীকি তার প্রতি মনোযোগ দেয়নি বলেই রবীন্দ্রনাথ এ প্রবন্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রবন্ধটি সম্পর্কে বলেছেন – “সমস্ত রামায়ণের পটভূমিকা রাম-সীতাকে কেন্দ্র করিয়া পরিকল্পিত। এই কেন্দ্রস্থ দম্পতির জীবন মহিমা ফুটাইয়া তুলিতে অন্যান্য সমস্ত চরিত্র। নিয়োজিত, তাহাদের স্বেচ্ছাবিলুপ্তির উপায়েই তাহাদের নভোস্পর্শী উত্তুঙ্গতা প্রতিষ্ঠিত। লক্ষ্মণের দাম্পত্যজীবনের কাহিনি চিত্রের অন্তর্ভুক্ত করিলে ঊর্মিলার মনোবেদনা সীতার ভাগ্যহত ও প্রিয় বঞ্জিত জীবন-বিপর্যয়ের সহিত যুক্ত হইলে রামায়ণের করুণরসের অলৌকিক গৌরব ক্ষুব্ধ হইত। তাহার আদর্শ রূপান্তরিত ও মূল্যান্তরিত হইত। কাজেই বাল্মীকি সমগ্রের ভাবসঙ্গতির জন্য ব্যক্তিকে বলি দিতে বাধ্য হইয়াছেন। ঊর্মিলাকে সীতার দুর্ভাগ্যের সহযোগিতা করিয়া দেখাইলে সীতা চরিত্রের অপরূপ মাহাত্ম্য অবনমিত হইত। কাজেই পাদপ্রদীপের সমস্ত আলোক সীতার উপর কেন্দ্রীভূত করার জন্য ঊর্মিলাকে নেপথ্যে নির্বাসনে পাঠাইতে হইয়াছে। ইহা কাব্যের প্রয়োজনে জীবনের প্রতি অবিচার, কিন্তু ইহার কোনো প্রতিকার নাই।” মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ তাই ঊর্মিলার ব্যথিত নারীহৃদয়ের প্রতি বর্তমান পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।



প্রশ্ন : কাব্যের মধ্যে সকলের সমান অধিকার থাকিতে পারে না। কঠিন হৃদয়ের কবি তাঁর নায়ক নায়িকার জন্য কত অক্ষয় প্রতিমা গড়িয়া নির্মমচিত্তে বিসর্জন দেন। কিন্তু তিনি যেখানে কাব্যের প্রয়োজন বুঝিয়া নিঃশেষ করিয়া ফেলেন সেইখানেই কি তাহার সম্পূর্ণ শেষ হয়।”—এ প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য কি তা লেখো।


উত্তর। কাব্য অন্তরের প্রকাশযোগ্য অনুভূতির সংযত বর্ণনা। তিনি তাঁর কাব্যে ঠাই দিতে পারেন। না। ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে কবির কাব্যে রসোত্তীর্ণ হয় না। তাই কবিকে সংযত সুসংবদ্ধ পথ ধরে চলতে হয়। এই চলার পথে তিনি কাব্যের রসমাধুর্যানুসারে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করেন আবার কাব্যের খাতিরেই তা নিঃশেষ করেন। সেসব চরিত্রগুলির আর বৃদ্ধি বা ব্যাপকতা ঘটান না। কাব্যের মাধুর্য রক্ষা করতে কবিকে এরূপ নির্মম কার্যও করতে হয়। যে চরিত্র তিনি সযত্নে সৌখিন হস্তে নির্মাণ করেন—সেই চরিত্রকে নিজেই আবার নির্মম হস্তে ভেঙে চুরমার করেন। এইভাবে কাব্যে কত নায়ক নায়িকার, কত চরিত্রের সমাবেশ ঘটে। আবার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে কাব্যের সোনালী প্রত্যূষে, অথবা প্রথর মধ্যাহ্ণে অথবা রঙিন সন্ধ্যায় সেসব নায়ক নায়িকাকে কবি কাব্যের মধ্য থেকে বিদায় দিয়ে দেন। কিন্তু কাব্যের মধ্যে তাদের আর দেখা না গেলেও পাঠক পাঠিকার হৃদয়মণে তারা সদা জাগ্রত থাকে। সেখানে তাদের প্রবেশ আর প্রস্থান ঘটতেই থাকে। তারা যেকথা বাক্যে সুযোগ পায়নি সেকথা তারা পাঠকবৃন্দের মনে অতি সংগোপনে বলতে থাকে। কাব্যে তারা উপেক্ষিত, অবহেলিত হলেও পাঠকগণের অনুভূতি রাজ্যে তারা সদা বিরাজমান। বাল্মীকির রামায়ণ' মহাকাব্যে ঊর্মিলার চরিত্র এমনি ভাবে প্রত্যুষের মত মহাকাব্যের সুমেরু শিখরে একবার মাত্র বধূবেশে উদিত হয়েছিল। তারপর কখন কোথায় অস্ত গেল তা আর জানা গেল না। কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' সংস্কৃত নাটকে প্রিয়ংবদা ও অনুসূয়া নামক সখীদ্বয় পতিগৃহগামিনী শকুন্তলাকে বিদায় দিয়ে আশ্রমে ফিরে এল-কিন্তু তারপর তাদের উপস্থিতি বা উল্লেখ আর কাব্যে ঘটেনি। অনুরূপভাবে বাণভট্টে 'কাদম্বরী' কাহিনির পত্রলেখাও কাব্যের রসমাধুর্যের প্রয়োজনে কাব্যে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু তারপর কাব্যের প্রয়োজনেই তাকে এক আত্মানুভূতিহীন যুবরাজ চন্দ্রাপীড়ের ছায়াস্বরূপ প্রতিবিম্ব করা হয়েছে। এই তিনটি কাব্যে উক্ত চারটি নারী চরিত্র উপেক্ষিতা। কবি স্বহস্তে এদের সৃষ্টি করেছেন আবার কাব্যের প্রয়োজনে স্বহস্তে এদের বিসর্জন দিয়েছেন। অবশ্য এই বিশ্লেষণ ব্যক্তিনিষ্ঠ (Subjective), বস্তুনিষ্ঠ (Objective) নয়। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টি ভঙ্গিতে কাব্যের নিয়ম নীতিতে ব্যক্তিগত ভাবাবেগের স্থান নেই আর তা নেই বলেই কবিগণ নির্মম চিত্তে ঊর্মিলা প্রিয়ংবদা, অনুসূয়া, পত্রলেখার মত রমণীকে কাব্য থেকে অকস্মাৎ বিদায় দিয়েছেন। আর কবিগণ নির্মম কঠিন হৃদয়ে এদের বিদায় দিয়েছেন বলেই এরা পাঠকগণের স্পর্শকাতর অন্তরে মমতার মধুর অমর প্রতিমা হয়ে বিরাজ করছে।


৬। বৃিত্তচ্যুত ফুলের উপর দিবসের সমস্ত প্রখর আলোক সহ্য হয় না। অন্তরাল ব্যতীত সে আলোক তাহার উপর তেমন কোমল ভাবে পড়ে না— এখানে বৃত্তচ্যুতফুলের সঙ্গে কাকে তুলনা করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।

উত্তর :  পুষ্পের জীবন উৎস হল বৃত্ত – আর রক্ষক পল্লব। বৃক্ষকে আশ্রয় করে পল্লবের অন্তরালে। পুষ্প ক্রমশঃ পুষ্টিলাভ করে এবং প্রস্ফুটিত হয়। তীব্র জীবনের রূপ রস গন্ধ বিকাশের জন্য প্রায় সর্বাংশে সে বৃত্ত আর পল্লবের নিকট ঋণী। বৃত্তের রস পুষ্পের জীবনে সঞ্চারিত হয়, পল্লবের কমনীয় শীতল আচ্ছাদন তার জীবনকে বেষ্টন করে থাকে। তাই পুষ্প প্রখর রৌদ্রের তাপ অকাতরে সহ্য করতে পারে। সে আলোক তখন তার ক্ষুধা তৃপ্ত করে—তার জীবনে কমনীয় ও কোমল রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু পুষ্প যদি বৃত্তচ্যুত হয় তাহলে সে হয়ে পড়ে একা। তার জীবনরস ধীরে ধীরে শুষ্ক হতে থাকে। জীবনদাতা সূর্যালোক তখন তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে স্নান করে তোলে। হারিয়ে ফেলে সে জীবনের ভাব ভাষা পরিচয়। শুষ্ক পুষ্প পড়ে যাকে রূপ-রস গন্ধহীন অবস্থায় এক অপরিচিত সত্তায়। কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' নাটকের নায়িকা শকুন্তলা কন্বমুনির আশ্রমে লালিতা পালিতা। তার আশ্রমিক জীবনে পল্লবসদৃশ সহচরীদ্বয় প্রিয়ংবদা ও অনসূয়া তাকে আচ্ছাদন করে রেখেছিল। শকুন্তলার আশ্রমের বৃত্তে ক্রমশঃ প্রস্ফুটিত হয়েছে। সখীরা তাঁকে অন্তরাল করে পূর্ণ যৌবনে বিকশিত হতে সহায়তা করেছে। তার ফলেই শকুন্তলার জীবনে রাজা দুষ্মন্তের সঙ্গে প্রণয় ও পরিণয় আশ্রমিক জীবনে সংঘটিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু পতিগৃহে শকুন্তলা রাজ-পরিবেশে বৃত্তচ্যুত পল্লবহীন পুষ্পসম প্রতিভাত হয়েছে। ফলে রাজা দুষ্মন্ত আপন পত্নীকেও অপরিচিতা জ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মহাকবি কালিদাস শকুন্তলার এই পরিচয়হীনতাকে দুর্বাসামুণির অভিশাপ রূপে কাব্যে বর্ণনা করেছেন। মূলতঃ শকুন্তলা পতিগৃহে বৃত্তচ্যুত পুষ্পবিশেষ। তার জীবনের দুই তৃতীয়াংশ অধিকার করেছিল। আশ্রমিক পরিবেশ ও প্রিয়ংবদা, অনসূয়া। শকুন্তলা তার নিজের জীবনের মাত্র এক তৃতীয়াংশ। সুতরাং রাজা দুষ্মন্ত যে পূর্ণ শকুন্তলাকে আশ্রমে বৃত্তে, প্রিয়ংবদা অনসূয়ারূপ পদ্মরের অন্তরালে বিকশিত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন—সেই আংশিক শকুন্তলাকে বৃত্তচ্যুত পল্লবহীন অবস্থায় রাজদরবারে চিনতে সক্ষম হননি। যে প্রণয়ের আলোক আশ্রম জীবন সখী পরিবেষ্টিতা অবস্থায় সহ্য হয়েছিল — রাজদরবারে প্রণয়ের আলোক আর সেরূপ কোমল কমনীয় না হয়ে রুদ্ররূপ ধারণ করলো। বৃত্তচ্যুত পুষ্পের বাস্তব অবস্থায় যা ঘটে—শকুন্তলার জীবনে তার কণামাত্র কম ঘটে না। সুতরাং পতিগৃহে রাজদরবারে শকুন্তলা বৃত্তচ্যুত পুষ্পই বটে।


৭। “এই প্রকার অপরূপ সখিত্ব দুই সমুদ্রের মধ্যবর্তী একটি বালুতটের মতো। কেমন করিয়া তাহা রক্ষা পায়।”—এখানে অপরূপ সখিত্ব বলতে কি বোঝানো হয়েছে এবং তা কি করে রক্ষা পেয়েছে আলোচনা করো।

উত্তর : রাজকুমার চন্দ্রাপীড় এবং রাজকুমারী বন্দিনী পত্রলেখার অপরূপ সখীত্ব দুই সমুদ্রের মধ্যবর্তী বালুতটের সহিত কল্পিত ও উপমিত হয়েছে। দু'পাশে দুটি সমুদ্র— মাঝখানে সংকীর্ণ বালুতটে।। সমুদ্রের উদ্দাম তরল্পমালা আপন উচ্ছ্বাসে মধ্যবর্তী বালুতটকে গ্রাস করার অহরহ চেষ্টা করে। জলের ধর্ম স্থলকে ধ্বংস করা। সুতরাং দুই সমুদ্রের আগ্রাসী উচ্ছ্বাসে বালুতটের পক্ষে জলতলে লীন হওয়াই স্বাভাবিক। অপর অস্তিত্ব সে বেশিক্ষণ বা বেশিদিন বজায় রাখতে সক্ষম হতে পারে না। কারণ প্রকৃতির স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিকে বোধ করা অসম্ভব। এই অসম্ভব কাজকে বাণভট্ট তাঁর কাদম্বরী কাব্যে পত্রলেখার জীবনে সম্ভব করার প্রয়াস পেয়েছেন। পত্রলেখা কুমারী, অনতিযৌবনা। তবু সে চন্দ্রাপীড়ের পত্নী বা প্রণয়িনী বা কিংকরী কোনোটাই নয়। সে কেবল চন্দ্রাপীড়ের সহচরী মাত্র। নবযৌবন কুমার কুমারীর মধ্যে অনাদীকালের চিরন্তন এক প্রবল আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও কোনো সময়ে কেউ মোহাবিষ্ট হয়ে আকৃষ্ট হয়নি। উভয়ে সমান্তরাল গতিতে জীবনপথে এগিয়ে গেছে—কিন্তু কখনো মিলিত হওয়ার অবকাশ পায়নি। অন্তরের অব্যন্ত যৌবন তরঙ্গ উদ্বেলিত হলে তাদের জীবনের সমুদ্রের মধ্যবর্তী বালুতটে তা কখনো উদ্বেল হয়ে উঠে নি। এ এক বাস্তবতার চরম ব্যতিক্রম। উভয়ের মধ্যে যৌবনের উত্তাপ আছে কিন্তু একজন অপরজনকে আকর্ষণ করছে না- উভয়ের যৌবন সমুদ্রে উত্তাল তরঙ্গ ও উচ্ছ্বাস আছে। কিন্তু জলাভূমি অতিক্রম করে বালুতটের ব্যবধান নস্যাৎ করছে না। চন্দ্রাপীড় ও পত্রলেখা এগিয়ে চলেছে পরস্পর পাশাপাশি, কাছাকাছি হয়ে সমান্তরাল গতিতে, মিলনের সুযোগ ও প্রয়াস না রেখেই। এরূপ অপরূপ সখীত্ব কাব্যে ও বাস্তবে বিরল।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ