সাহিত্যের উদ্দেশ্য (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধের সাজেশন ২০২২ | 1st semester Bangla sahitter uddesso suggestion 2022


 সাহিত্যের উদ্দেশ্য সাজেশন 2022
       লেখক : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) |অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর | সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ সাজেশন | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর সহ ২০২২

 

১। সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধটির রচনাকাল উল্লেখ করো।

উ: সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধটির রচনাকাল হল বৈশাখ ১২৯৪ বঙ্গাব্দ।

২। 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধটি কোন্ প্রবন্ধের অন্তর্গত? 

উ: 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধটি 'সাহিত্য' প্রবন্ধ সংকলন সমূহের অন্তর্গত।

৩। এই প্রবন্ধ গ্রন্থটি রবীন্দ্ররচনাবলীর কোথায় স্থান পেয়েছে? 

উঃ রবীন্দ্র রচনাবলীর যে 'অচলিত সংগ্রহ' আছে তার মধ্যে প্রবন্ধ সংকলন সমূহ অন্তর্গত সাহিত্য প্রবন্ধ গ্রন্থ।

৪। 'সাহিত্যে প্রবন্ধ' গ্রন্থের ক-টি প্রবন্ধ আছে?

উ: 'সাহিত্যে প্রবন্ধ' গ্রন্থের ৩১ টি প্রবন্ধ আছে। 

৫। এই সাহিত্য প্রবন্ধ গ্রন্থে সাহিত্যের উদ্দেশ্য ছাড়া আরও চারটি প্রবন্ধের নাম লেখো। 

উঃ চারটি প্রবন্ধের নাম হল – 'সাহিত্য', 'সাহিত্য ও সভ্যতা', 'সাহিত্যের সৌন্দর্য ও ‘সাহিত্যের 'গৌরব'। 

৬। 'সাহিত্যে প্রবন্ধ' সন্ধের প্রথম ও শেষ প্রবন্ধের নাম লেখো।

উ: প্রথম প্রবন্ধের নাম 'ভুবনমোহিনী প্রতিভা, অবসর সরোজিনী ও দুঃখসঙ্গিনী', শেষ প্রবন্ধের নাম—'মেয়েলি রঙ'। 

৭। 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধের প্রথম লাইনটি কিং

উ: প্রথম লাইনটি হল—“বিষয়ী লোকে বিষয় খুঁজিয়া মরে। লেখা দেখিলেই বলে, বিষয়টি

৮। বিষয় বিশুদ্ধ সাহিত্যের প্রাণ নহে ---প্রাবন্ধিক একথা কেন বলেছে? 

উ: বিশুদ্ধ সাহিত্য বলতে রবীন্দ্রনাথ বিষযুক্ত সাহিত্যের কথা বলেননি, সাহিত্যে বিষয় থাক, বা না, থাক তাতে কিছু আসে যায় না, বিশুদ্ধ সাহিত্যে বিষয়৷ গৌণ।

৯। আজকাল লেখা পাইলেই তাহার উদ্দেশ্য বাহির করিতে চেষ্টা করে"- এখানে কাদের কথা বলা হয়েছে? তার কারণ কি?

উঃ এখানে বাংলা ভাষার সাহিত্য সমালোচকবাদের কথা বলা হয়েছে। তার কারণ হল এরা উদ্দেশ্য করিতে না পারলে লিখতে পারেনা। 

১০। সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাকে রবীন্দ্রনাথ কোন ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন?

উ: সাহিত্যের মধ্যে থেকে উদ্দেশ্য খুঁজে বের করবার চেষ্টায় তিনি উদাহরণ দিয়েছেন যে শিক্ষকের কুঁটি ধরে মারার অভ্যাস, সে যদি মুণ্ডিত মস্তক ছাত্র পায়, তখন তার পক্ষে দুঃখের কারণ হয়। 

১১। ঐতিহাসিক রচনা কোন গুণে বেঁচে থাকে?

উঃ ঐতিহাসিক রচনায় ইতিহাস অংশটুকু অসত্য বলে প্রমাণিত হলেও সেই রচনাটি বেঁচে থাকতে পারে, একমাত্র তার সাহিত্য গুণের জন্য। 

১২। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের কোথায় প্রভেদ?

উ: দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি নির্মাণধর্মী', তাদের বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে, কোনো একটা বিশেষ তত্ত্ব নির্ণয় বা কোনো একটা বিশেষ ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে দর্শন, বিজ্ঞান বা ইতিহাস এগিয়ে চলে। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি-ধর্মী। তার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। সাহিত্যেই সাহিত্যর উদ্দেশ্য।

১৩। রবীন্দ্রনাথক সাহিত্য শব্দের কি ব্যাখ্যা করেছেন?

উ: সাহিত্য অর্থে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— 'সাহিত্য অর্থেই একটু থাকিবার ভাব মানবের সহিত থাকিবার ভাব-মানবকে স্পর্শ করা, মানবকে অনুভব করা।"

১৪। সাহিত্য দিয়ে আমরা কি করি? 

উঃ- সাহিত্যের প্রভাবে আমরা হৃদয়ের দ্বারা হৃদয়ের যোগ অনুভব করি। হৃদয়ের প্রবাহ রক্ষা হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় খেলতে থাকে। হৃদয়ে জীবন ও স্বাস্থ্য সম্ভার হয়।

১৫। সাহিত্যের উদ্দেশ্য কি?

উ: সাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দ। আর আনন্দই সাহিত্যের আদি-অন্ত্য-মধ্য। যেহেতু এটা সৃষ্টি আর সেই সৃষ্টির উদ্দেশ্য আনন্দ, আনন্দই সৃষ্টির মূল কথা।


সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | মধ্যমমানের প্রশ্নোত্তর |৫ নম্বরের প্রশ্নোত্তর | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ সাজেশন | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর সহ ২০২২
 

১। বিষয় বিশুদ্ধ সাহিত্যের দ্বারা নহে”-তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। 

উত্তর :  রাবীন্দ্রনাথ সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সাহিত্য তত্ত্ব সম্পর্কে মৌলিক ধারণাটি দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের কথায়" 'সহিত' শব্দ হইতে 'সাহিত্য' শব্দের উৎপত্তি, অতএব  ধাতুগত অর্থ ধরিলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। সে যে কেবল ভাবে-ভাবে, ভাষায় ভাষায়, গ্রন্থে গ্রন্থে মিলন তাহা নহে, মানুষের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, দ্রবের সহিত নিকটের অন্তরা যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর কিছুর দ্বারাই সম্ভবপর নহে।” এই প্রসঙ্গে ধরেই রবীন্দ্রনাথ 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধে বলেছেন – বিষয় বিশুদ্ধ সাহিত্যের প্রাণ নহে। তিনি শিল্পের জন্য শিল্প এই মতবাদে বিশ্বাসী। অর্থাৎ তিনি কলা কৈবল্যবাদী। উচ্চাঙ্কোর শিল্পকলায়, সাহিত্যে যদি বিষয়, জ্ঞান, তত্ত্ব না থাকে, তাহলে সেসব কোনো কাজের জিনিস নয়। বিষয়ী লোক একথা মনে করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মনে করেন সাহিত্যে বিষয় বলে কিছু না থাকলেও কিছু আসে যায়। না। এক ধরনের সমালোচক আছেন যারা সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্যের অন্বেষণে তৎপর হন। রবীন্দ্রনাথ এই অভ্যাসটিকে সাধু বলে মনে করেন না। এ ধরনের ব্যাপারকে তিনি 'মুণ্ডিত-মন্তকা ছাত্রকে ঝুটি ধরে মারার বদঅভ্যাস বলে মনে করেন।।

প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ আপাদমস্তক কবি, তাই প্রবন্ধের উদাহরণে তাঁর কবিসত্ত্বা নিহিত। তিনি এখানে একটা সুন্দর দৃষ্টান্তের সাহায্যে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। গঙ্গা নদী তার তরঙ্গমালা, তার জলের ওপর পড়া সূর্যালোক, কলধ্বনি ইত্যাদি নিয়ে যা অপূর্ব তা বিষয়ী লোক বুঝবে না। বিষয়ী লোক যদি গঙ্গার জল মেরে তার বিষয়টুকু বের করে তাহলে পরিশ্রমের পুরস্কার হিসাবে বিপুল বাষ্প ও 'প্রচুর পঙ্ক' লাভ করবে, কিন্তু গঙ্গার তরঙ্গ তার ওপর সূর্যালোক, কিংবা কলধ্বনি কি পাবে? তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-- "বিষয় বিশুদ্ধ সাহিত্যের প্রাণ নহে।”

২। উদ্দেশ্য না থাকিয়া সাহিত্যে এইরূপ সহস্র উদ্দেশ্য সাধিত হয়। -ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর। 'সাহিত্যদর্পণাকার বিশ্বনাথ কবিরাজ সাহিত্যকে চতুরা (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) কলা প্রাপ্তির উৎস বলে নির্দেশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন সাহিত্য উদ্দেশ্যহীন। সাহিত্যে যারা উদ্দেশ্যবাদী তারা সাহিত্যে নানা উদ্দেশ্য অন্বেষণ করেন। সাহিত্যে কেউ শিক্ষা, কেউ নীতি, কেউ সমাজ বা রাষ্ট্রের হৈতিষণা, জনকল্যাণকারিণী, বাণী ইত্যাদি নানা কিছু শিক্ষণীয় বিষয় আশা করেন। তাই সাহিত্য যে অপ্রয়োজনের আনন্দ তা তাঁরা জানেন না। তাঁরা সাহিত্যের মধ্যে বস্তুগত উপযোগিতার উপাদান পেতে চান। তাদের কাছে কালিদাসের 'মেঘদূত' শিঙ্গাররসাত্মক কাজ। অথচ “মেঘদূত' কাব্যটি রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি নিটোল কাব্য সৃষ্টি, তার রস গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বিশুদ্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য নেই—এই মতবাদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, বিষয়ী লোক বিষয়ের সন্ধান করে। বৈষয়িক লাভ তার একমাত্র উদ্দেশ্য। সাহিত্যে স্থূলবস্তু লভা নয়। তার মধ্যে যদি কিছু বস্তু পাওয়ার থাকে তবে তা হল রসবস্তু অর্থাৎ আনন্দ। সুতরাং প্রচলিত ধারণায় যাকে উদ্দেশ্য বলা হয়, সাহিত্যে সেই বস্তু পাওয়া যায় না। যদি বা তেমন কিছু বস্তু সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়, তা নিতান্তই গৌণ এবং অস্থায়ী। তাই তিনি বলেছেন— "বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য বলিয়া যাহা হাতে ঠেকে তাহা আনুষঙ্গিক এবং তাহাই ক্ষণস্থায়ী। যাহার উদ্দেশ্য আছে তাহার নাম--কোনো একটা বিশেষ তত্ত্ব নির্ণয় বা কোনো একটা বিশেষ ঘটনা—বর্ণনা যাহার উদ্দেশ্য তাহার লক্ষণ-অনুসারে তাহাকে দর্শন, বিজ্ঞান বা ইতিহাস বা আর কিছু বলিতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের উদ্দেশ্য নাই।" 


সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) | রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর | বড় প্রশ্নোত্তর | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ সাজেশন | সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর সহ ২০২২

 

১ । প্রধান দিক রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধে সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কি কি বলেছে ? 

উত্তর : সাহিত্যের কোন উদ্দেশ্য নেই। সাহিত্য কোন প্রকার নয়। সাহিত্য কোন জ্ঞান নয়, কোন তথ্য নয়। সাহিত্যের যদি কোন উদ্দেশ্য থাকে তবে তা আনন্দ। স্বল্প কথার সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধটির বক্তব্য এই।

বিষয়ী লোক অন্য সমস্ত কিছুর মতো সাহিত্যের বিষয়ের  খোঁজে থাকেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সাহিত্যে বিষয় থাক বা না থাক তাতে কিছু আসে যায় না। উচ্চ শ্রেণির কলার বিষয় গৌণ। রবীন্দ্রনাথ দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন। বিষয় বিশুদ্ধ সাহিত্যের প্রাণ নহে। উচ্চ শ্রেণির কলায় এমন কিছু প্রাপ্তব্য যা মানুষের প্রাণের সঙ্গে অতুলনীয়। মানুষের সর্বাঙ্গে যেমন প্রাণের বিকাশ এবং মানুষের দেহ থেকে তার প্রাণ বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া যায় না, তেমনি প্রকৃত সাহিত্যের ভেতর থেকে তার 'উদ্দেশ্যটুকু' বের করা সহজ হয়, কেননা, তার 'মর্মটুকু সহজে ধরা দেয় না। সাহিত্যের মধ্যে থেকে উদ্দেশ্য খুঁজে বের করবার চেষ্টা মুণ্ডিত মস্তক ছাত্রের ঝুটি ধরার অভ্যাস বলে মনে করেন রবীন্দ্রনাথ। যদি তর লাভ পাময় চূর্ণ-বিচূর্ণ সূর্যালোক খচিত অবিশ্রাম প্রবাহমান জাহ্নবীর জল থেকে তার 'সারটুকু'। বের করবার জন্য পড়াপড়া জল তুলে চুল্লির ওপর চড়ানো হল তাহলে লাভ হবে 'বিপুল বাষ্প ও প্রচুর পঙ্ক', কিন্তু 'তরলা', 'সূর্যালোক', 'কলধ্বনি', কিছুই মিলবে না। যদি গঙ্গায় তোলপাড় করে খোঁজাখুঁজি করা হয় তাহলে পাকের মধ্যে চিংড়ি মাছের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এই পর্যন্ত, জেলের কাছে তা কিশিত লাভজনক হতে পারে, কিন্তু চিংড়ি মাছ না থাকলেও গঙ্গার মূলগত কোনো প্রভেদ হয় না। যে গঙ্গায় প্রবাহ নেই, 'ছায়ালোক বিচিত্র তরা মালা' নেই, 'প্রশান্ত প্রবল উদারতা নেই, 'সে-গলা গলাই নয়। গলার চিংড়ি মাছ ধরে ডাঙার তুলে আনা সহজ, কিন্তু তার 'প্রবাহ', 'ছায়ালোক' 'প্রশান্ত ভাব' এ-সব ডাঙায় তোলা যায় না, কেননা তা অনুভবের বস্তু। সাহিত্যের যারা বিষয় অন্বেষণ করেন তারা গলায় চিংড়ি মাছ সন্ধান করেন, কেননা সাহিত্যের উদ্দেশ্য বিষয় নয়। সাহিত্য অনুভবের বস্তু। বিশুদ্ধ সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।

আপাতদৃষ্টিতে থাকে বিষয় বলে মনে হয় তা 'আনুষঙ্গিক' এবং 'ক্ষণস্থায়ী'। প্রকৃতপক্ষে যার উদ্দেশ্য থাকে তাকে অন্য নামে অভিহিত করা যায়, কিন্তু সাহিত্য নয়। বিশেষ একটা তত্ত্ব-নিৰ্ণয় বা কোনো একটা ঘটনা বর্ণনা যার উদ্দেশ্য তা আসলে দর্শন, বিজ্ঞান বা ইতিহাস বা আর কিছু, কিন্তু সাহিত্য নয়। ঐতিহাসিক বিষয় অবলম্বনে রচিত সাহিত্যেও ইতিহাস গৌণ, সাহিত্যই প্রধান। প্রাবন্ধিক মনে করেন, ঐতিহাসিক রচনায় ইতিহাস অংশটুকু অসত্য বলে প্রমাণিত হলেও কোনো রচনা বেঁচে থাকতে পারে তার সাহিত্য গুণের জন্যই। ইতিহাস প্রধান সাহিত্যে ইতিহাস উপলক্ষমাত্র লক্ষ নয়।

প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সৃষ্টি ও নির্মাণ এক জিনিস নয়। সৃষ্টির উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু নির্মাণের উদ্দেশ্য থাকে। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ উদাহরণ দিয়েছেন—ফুল কেন ফোটে তা কেউ অনুমান করতে পারে না, কিন্তু ইটের পাঁজা পোড়ার এবং সুড়কির কল চলার কারণ সকলেই জানে। সাহিত্য এবং বিভিন্ন ললিতকলা সৃজনধর্মী, তাদের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি নির্মাণধর্মী। তাদের বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করেন যে, অন্তরের যোগেই প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টি। সৃষ্টির মধ্যে যেমন উদ্দেশ্য নেই, তা স্বভাবজাত সাহিত্যও সেইরকম— হৃদয়ের আনন্দময় সত্ত্বার প্রকাশে তা অনিবর্তনীয় হয়ে ওঠে। তার কাছে সাহিত্য, রস ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের বস্তু নয়—তা অনুভূতির বিষয়।

প্রাচীন আলংকারিকদের সাহিত্য তত্ত্বকে জটিলতার কবল থেকে মুক্ত করে তিনি বিজ্ঞান ও সৌন্দর্য সৃষ্টি আলোক বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়েছেন। অন্তরের বিষয়কে বাইরের, ভাবের বস্তুকে ভাষার এবং ব্যক্তির ভারকে বিশ্বজনীন করে তোলাই সাহিত্যের প্রধান কাজ। রবীন্দ্রনাথের কথায় 'সহিত' শব্দ হইতে 'সাহিত্য' শব্দের উৎপত্তি, অতএব ধাতুগত অর্থ ধরিলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখিতে পাওয়া যায় সে যে কেবল ভাবে-ভাবে, ভাষায় ভাষায়, গ্রন্থে প্রন্থে মিলন, তাহা নহে। মানুষের অতীতের সঙ্গো বর্তমানের, দূরের সহিত নিকটের অন্তরা যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর কিছুর দ্বারাই সম্ভবপর নহে।” ফলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন সাহিত্যই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। এ যেন কলা কৈবল্যবাদীদের তথারই প্রতিধ্বনি 'শিল্পের জন্যই শিল্পা।

যাঁরা হিসেবি বা বিষয়ী মানুষ, তাঁরা বলবেন— সাহিত্যের যখন কোনো উদ্দেশ্য নেই তখন সাহিত্যের দরকার কি? তবে পাশ্চাত্য সমালোচকেরা অন্য কথা বলেছেন— তারা মনে করেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বাস্তবকে আদর্শায়িত করে নতুন করে সৃষ্টি করে তোলেন তবেই তো তাঁদের শিল্পীসত্ত্বা তৃপ্তিলাভ করে এবং পাঠকেরা তা আনন্দে গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথ আসলে, দেখাতে চেয়েছেন জীবন ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য যোগকে। সেই যোগ সাহিত্যের কল্পনার দ্বারা। অর্থাৎ তিনি লিখেছেন, “সাহিত্য ঠিক প্রকৃতির আরশি নহে। কেবল সাহিত্য কোনো কোনো কলাবিদ্যাই প্রকৃতির যথাযথ অনুকরণ নহে।" তাই রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সাহিত্য রসনার তৃপ্তি বা উদরের পুঁতি সাধনা করেনা। তার থেকে আমরা লাভ করি এক বিশাল আনন্দ।

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেছেন—সাহিত্য অর্থে একত্ব থাকিবার ভাব মানবের সহিত থাকিবার ভাব-মানবকে স্পর্শ করা, মানবকে অনুভব করা। একের সঙ্গে অপরের হৃদয়ের সংযোগ সাধন করার উপায়ই সাহিত্য। যুক্তি শৃঙ্খলার দ্বারা মানুষের বৃদ্ধি ও জ্ঞানের ঐক্যসাধন হয়, কিন্তু হৃদয়ে হৃদয়ে বাধবার এরকম কৃত্রিম উপায় নেই। সাহিত্যের দ্বারা হৃদয়ের সাকো হৃদয়ের বন্ধন ঘটানো সম্ভব হয়, রবীন্দ্রনাথ যাকে প্রবন্ধের ভাষায় রূপ দিয়েছেন-- "সাহিত্যের প্রভাবে হৃদয়ের শীত শীতাতপ সঞ্চারিত হয়, বায়ু প্রবাহিত হয়, তুর ফিরে, গল্প-গান ও গ্রুপের হাট বসিয়া যায়।” উদ্দেশ্যহীন হয়েও সাহিত্যে এরকম শতসহস্র উদ্দেশ্যসাধন করে।

যারা সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বস্তুতন্ত্রবাদী, তারা নীতিবোধ, সমাজকল্যাণের আদর্শ প্রভৃতি মনোভাবকে কখনোই গুরুত্ব দিতে চান না। আবার কোনো কোনো সমালোচক বাস্তবতা বলতে অনেক সময় নগ্ন বাস্তব ও কুৎসিত মনোবৃত্তি বলেও মনে করেন। কিন্তু একথাও সমানভাবে সত্য যে, সাহিত্য রসসৃষ্টির নাম করে বিভীষিকা সৃষ্টির নিশ্চয়ই বস্তুতন্ত্র বাদের অনকূল নয়, বাংলা সাহিত্যে এক সময় যাকে সবচেয়ে বড়ো বস্তুবাদী বলে সমালোচনা করা হয়েছিল, সেই শরৎচন্দ্রকে তার নিজের ভক্তি দিয়ে বিষয়টিকে বিচার করা যেতে পারে। তিনি নিজে লিখেছেন- ...অতএব যা অসুন্দর, যা Immoral বা অকল্যাণ, কিছুতেই তা Art নয়। ধর্ম নয়। Art for Arts Sake কথাটা যদি সত্যি হ্যা, তাহলে কিছুতেই তা Immoral এবং অকল্যাণকর হতে পারে না এবং অকল্যাণকর Immoral হলে Art for Arts Sake কথাটাও কিছুতেই সত্য নয়।" সাহিত্য ললিতকলা প্রভৃতি লক্ষ ও উদ্দেশ্য আনন্দ। আনন্দই সাহিত্যের আদি-অন্ত মধ্য। রবীন্দ্রনাথ বলেন সাহিত্যেই উদ্দেশ্য। আর তার যদি কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে ধরা হয়, তবে সে আনন্দ। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ